সর্বশেষ

» ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ঠিক করি ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে

প্রকাশিত: ১০. ফেব্রুয়ারি. ২০২৬ | মঙ্গলবার

সিলেট বিএম ডেস্ক ::: আগামী পরশু ঠিক তেমনই একটি দিন, যেদিন দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা সবাই মিলে নতুন সরকার গঠনের নির্বাচন করব এবং পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করব। ভোটাধিকার কারো দয়া নয়; এটি আমাদের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই আমরা ঠিক করি, আমাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোট বিষয়ে জাতির উদ্দেশে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এমন মন্তব্য করেন। সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ হুবহু তুলে ধরা হলো।

আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ, ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যৎ নির্ধারক মুহূর্তে। আর মাত্র একদিন পরই সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তার সাথে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট। সারা জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার দিন। প্রত্যেক জাতির জীবনে এমন কিছু দিন আসে, যার তাৎপর্য থাকে সুদূরপ্রসারী; যেদিন নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, গণতন্ত্রের চরিত্র এবং স্থায়িত্ব ও আগামী প্রজন্মের ভাগ্য। আগামী পরশু ঠিক তেমনই একটি দিন, যেদিন দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা সবাই মিলে নতুন সরকার গঠনের নির্বাচন করব এবং পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করব। ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের সবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন নাগরিক হিসেবে আপনাদের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ভাগ করে নেওয়াকে আমি আমার নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব মনে করেছি।

প্রথমেই গভীর সন্তোষ ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সার্বিক প্রচার-প্রচারণা পূর্ববর্তী যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে, উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো সংযম দেখিয়েছে, প্রার্থীরা দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন এবং সাধারণ মানুষ সচেতন থেকেছেন। এই পরিবেশ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি—এটি সম্মিলিত দায়িত্ববোধের ফল। এ জন্য আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই দেশের সব রাজনৈতিক দল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, ভোটার, নির্বাচন কমিশন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মী এবং নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের প্রতিটি সদস্যকে। আপনাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি আশাব্যঞ্জক পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পেরেছি। তবে এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মাঝেও আমাদের হৃদয়ে গভীর বেদনার ছায়া রয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এবং প্রচার-প্রচারণাকালে সংঘটিত কয়েকটি সহিংস ঘটনায় আমরা কিছু মূল্যবান প্রাণ হারিয়েছি। এই সহিংসতা আমাদের জাতীয় বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়া—কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা এ যাবৎকালের যেকোনো নির্বাচনের মধ্যে সর্বাধিকসংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ। স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশী। আগের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে এর চেয়ে বেশি প্রার্থী প্রায় কখনোই দেখা যায়নি। এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না— একই সাথে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট। আমি সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাই—নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিন। বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আজ আমি বিশেষভাবে কথা বলতে চাই আমাদের তরুণ ভোটার ও নারী ভোটারদের সঙ্গে। আপনারাই সেই প্রজন্ম, যারা গত ১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে পারেননি। আপনারা বড় হয়েছেন এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে ভোটের মুখোশ ছিল—কিন্তু ভোট ছিল না; ব্যালট ছিল—কিন্তু ভোটার ছিল না। এই দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনা ও অবদমনের সবচেয়ে বড় মূল্য জাতিকে প্রতিদিন দিতে হয়েছে। তবু আপনারা আশা ছাড়েননি। অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। আন্দোলনে, প্রতিবাদে, চিন্তায় ও স্বপ্নে আপনারা একটি নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা লালন করেছেন। আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর সেই দিনটি এসেছে। বিশেষ করে আমাদের নারীরা—মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সবকটি গণআন্দোলন, পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সবখানেই শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। নারীরাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা। নারীরাই এদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শক্ত ভিত। ক্ষুদ্র ঋণ, কুটির শিল্প, নারী উদ্যোক্তা এই শব্দগুলোর পেছনে আছে পরিবর্তনের গল্প, পরিবার ও সমাজে স্বাবলম্বী হবার গল্প। আপনারা ঘরে, রাজপথে সমানভাবে সংগ্রাম করেছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ আগলে রেখেছেন, সমাজকে টিকিয়ে রেখেছেন, অথচ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নিজেদের মত প্রকাশের সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত হয়েছেন। এই নির্বাচন আপনাদের জন্য এক নতুন সূচনা। আর আমাদের তরুণরা—যাদের স্বপ্ন, মেধা ও শক্তিই আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি—এই ভোট আপনাদের প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ। তাই আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ নয়, দাবি জানাচ্ছি—ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে—এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনদিন হারাতে দেবে না।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এবার রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও ব্যাপকভাবে দায়িত্বে রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা দ্রুত ও কঠোরভাবে প্রতিহত করা যায়। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি তারা সকলেই ঈমান, দেশপ্রেম ও কর্তব্য নিষ্ঠায় উজ্জীবিত হয়ে তাঁদের উপর অর্পিত মহান দায়িত্ব সুষ্ঠু ও সুচারুরুপে পালন করবেন। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো সারাদেশে ব্যাপক পরিসরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা শরীরের সাথে সেঁটে রাখা ক্যামেরা ব্যবহার করছেন। নিরাপত্তা ও নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য—ভোটাররা যেন নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে ও সম্মানের সঙ্গে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। এই নির্বাচনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন‍্য আমরা কিছু ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী আমাদের ভাই-বোনেরা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশগ্রহণ করতে পারছেন—এটি আমাদের গণতন্ত্রের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। আমাদের এই নতুন অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশে প্রচলনের জন্য ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এবং আমাদের অভিজ্ঞতার প্রতিটি ধাপ তারা পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে দেশে অবস্থানরত সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আইনি হেফাজতে বা কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে—রাষ্ট্র কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে চায়। ভোটাধিকার কারো দয়া নয়; এটি আমাদের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই আমরা ঠিক করি, আমাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতে চাই—আপনারা দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্দেশ দিন, যেন কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল, ভোটে প্রভাব বিস্তার করা কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়। কেউ যেন সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনভাবে গুজব না-ছড়ায়। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এ ধরনের আচরণ সহ্য করবে না। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—একটি ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ বা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। বরং দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে। যারা জনগণের মতামত উপেক্ষা করে শক্তি ও অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে, তারা সবাই শেষ পর্যন্ত জনগণের আদালতে কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা লক্ষ্য করছি—একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে নাগরিকদের মনে সন্দেহ, ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করা, জনগণের আস্থাকে দুর্বল করা। আমি আপনাদের অনুরোধ করছি—সতর্ক থাকুন, দায়িত্বশীল থাকুন। যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার করবেন না। গুজবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা ও সত্য। নির্বাচন নিয়ে যারা বিগত মাসগুলিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল, তারা সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে তারা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আপনারা সকল প্রকার অপপ্রচার থেকে নিজেদের মুক্ত রাখুন। তথ্য যাচাইয়ের জন্য সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখুন। নির্বাচনবন্ধু হটলাইন— ৩৩৩- এতে ফোন করে সঠিক খবর জেনে নিন। এখন নতুন করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নাকি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে।

প্রধান উপদেষ্টা আরো বলেন, আমরা একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন থেকে মাত্র কয়েক ঘন্টা দূরে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের এই সুযোগ এনে দিয়েছে। যখন আমরা ভেবেছিলাম আরেকটি প্রহসনের নির্বাচনের জন্য আমাদেরেকে অপেক্ষা করতে হবে আরো পাঁচ বছর, তখনই আমাদের সন্তানরা হুংকার দিয়ে ভেঙে ফেলেছে গোলামির জিঞ্জির। সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে আজকের এই দিনটি আমরা পেয়েছি। অভ্যুত্থানের দিনগুলো এখনো আমাদের স্মৃতিতে টাটকা। দেয়ালের লিখনগুলো এখনো সারাদেশের দেয়ালে দেয়ালে জ্বলজ্বল করছে। দেয়ালে দেয়ালে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গ্রাফিতির মাধ‍্যমে লিখেছিল তাদের মনের কথাগুলো। সেখানে তারা বলেছে পরিবর্তনের কথা, সংস্কারের কথা। জুলাই সনদ কোনো দলের একক ইশতেহার নয়। দীর্ঘ নয় মাস ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদ প্রস্তুত করেছে। এই আলোচনায় অনেক প্রস্তাবের পক্ষে বিপক্ষে দীর্ঘ মতবিনিময় শেষে রাজনৈতিক দলগুলো এতে স্বাক্ষর করেছে। এই সনদ জাতির ভবিষ্যৎ পথচলার এক ঐতিহাসিক দলিল, গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। এই সনদের মাধ্যমে আমরা সংস্কারসমূহ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছি। তবে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহিতা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সমাজে সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ—এসবের সফল বাস্তবায়ন এককভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মতামত। কারণ একটি জাতীয় রূপান্তর কখনোই একক সিদ্ধান্তে বা একক শাসনের মাধ্যমে টেকসই হয় না। জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। পরিবর্তনের চূড়ান্ত বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকেই। তাই দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে জনগণকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেওয়াই হলো গণতান্ত্রিক পথের মূল ভিত্তি। এই লক্ষ্যেই আমরা গণভোটের আয়োজন করেছি—যাতে দেশের ভবিষ্যৎ সংস্কার-দিশা নির্ধারণে জনগণ সরাসরি নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারেন। এই গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখানে আপনার প্রতিটি ভোট আগামী দিনের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করবে। এর প্রভাব থাকবে বহু প্রজন্মজুড়ে। এই ভোটের মাধ্যমেই আপনারা জানি জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কার কাঠামোকে এগিয়ে নিতে চান কি না। আপনাদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র কোন পথে অগ্রসর হবে, শাসনব্যবস্থা কোন কাঠামোয় গড়ে উঠবে এবং একটি নতুন বাংলাদেশ কীভাবে তার গণতান্ত্রিক ও মানবিক রূপ লাভ করবে। এই গণভোটে আপনার একটি ভোট শুধু একটি কাগজে দেওয়া সিল নয়—এটি আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ, আপনার পরিবারের নিরাপত্তা এবং দেশের আগামী দিনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। আজ আপনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তার প্রভাব পড়বে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে। এটি এমন একটি মুহূর্ত, যেখানে নাগরিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব ও অধিকার এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে। আমি তাই আপনাদের সবাইকে এই গণভোটে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার জন‍্য আহ্বান জানাচ্ছি। অবশ্যই ভোট দিন। নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নিশ্চিত করুন। আসুন, আমরা সবাই মিলে দায়িত্বশীলতা, সচেতনতা ও শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে সফল করে তুলি। ভয় নয়—আশা নিয়ে; উদাসীনতা নয়—দায়িত্ববোধ নিয়ে; বিভক্তি নয়—ঐক্যের শক্তি নিয়ে আমরা ভোটকেন্দ্রে যাব। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য গণভোটের মাধ্যমেই আমরা প্রমাণ করব—বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে জানে। আপনার ভোটেই রচিত হবে গৌরবময় আগামীর বাংলাদেশের ইতিহাস।

প্রধান উপদেষ্টা আরো বলেন, নির্বাচন হয়ে গেলে নির্বাচিত সরকার দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তার সঙ্গে শেষ হবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এবং গৌরবের সঙ্গে নব-নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে, তাদের সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ কাজে ফিরে যাবো। আমরা এই শুভ মুহূর্তের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। আপনারা দলে দলে সপরিবারে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন। আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন। দেশের চাবি আপনার হাতে। সে চাবিটি সঠিকভাবে ব্যবহার করুন। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন। এবারের ভোটের দিন হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন। আসুন উৎসবমুখর নির্বাচন বাস্তবে রূপায়িত করে এই দিনটিকে ইতিহাসের স্মরণীয় দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রাখি।